বর্তমান যুগ হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং কারিগরি দক্ষতার যুগ। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি যে দেশের যুবসমাজ যত বেশি কারিগরি শিক্ষায় (Technical Education) শিক্ষিত, সে দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত বেশি উন্নত। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বেকারত্ব দূরীকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রধান হাতিয়ার হলো কারিগরি শিক্ষা। কিন্তু মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগই রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রেই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার মানুষের জন্য এই শূন্যস্থান পূরণে এবং কারিগরি শিক্ষার আলো প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে কৃষ্ণনগর, বীরগঞ্জ-এ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি আধুনিক ও বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—"ডা. ইঞ্জিনিয়ার মামুনুর রশীদ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট (DMRSTI)"।
প্রতিষ্ঠাতা পরিচিতি এবং ভিশন (About the Founder)
একটি মহৎ উদ্যোগের পেছনে সব সময়ই একজন স্বপ্নদ্রষ্টার অবদান থাকে। ডা. ইঞ্জিনিয়ার মামুনুর রশীদ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট-এর এই বিশাল ক্যাম্পাসের রূপকার এবং প্রতিষ্ঠাতা হলেন স্বনামধন্য ডা. ইঞ্জিনিয়ার মামুনুর রশীদ। প্রযুক্তি ও প্রকৌশলবিদ্যায় তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষানুরাগী মনন থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, আমাদের লোকালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের যদি সঠিক গাইডলাইন এবং আধুনিক ল্যাব-সুবিধা দেওয়া যায়, তবে তারা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সফল হতে পারবে।
তার ভিশন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—ঢাকা শহরের মতো উন্নত মানের কারিগরি শিক্ষা এবং ল্যাবরেটরি সুবিধা তিনি তার নিজের এলাকা বীরগঞ্জের মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসতে চেয়েছেন। এই মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে DMRSTI প্রতিষ্ঠা করেন।
DMRSTI-এর প্রধান অ্যাকাডেমিক প্রোগ্রামসমূহ
একটি দেশের অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য প্রধান দুটি পিলারের প্রয়োজন হয়—একটি হলো আইটি বা কম্পিউটার প্রযুক্তি, আর অন্যটি হলো বিদ্যুৎ বা ইলেকট্রিক্যাল প্রযুক্তি। ডা. ইঞ্জিনিয়ার মামুনুর রশীদ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (BTEB) অধীনে মূলত এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয়।
১. ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (Diploma in Computer Engineering)
তথ্যপ্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাহিদা আকাশচুম্বী। এই ডিপ্লোমা প্রোগ্রামটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে একজন শিক্ষার্থী হার্ডওয়্যার থেকে শুরু করে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট—সবকিছুতেই পারদর্শী হয়ে ওঠে।
- যা যা শেখানো হয়: প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ (C, C++, Java, Python), ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, ডাটাবেস ম্যানেজমেন্ট, নেটওয়ার্কিং, সাইবার সিকিউরিটি এবং অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট।
- ক্যারিয়ার সম্ভাবনা: পাস করার পর সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন আইটি ফার্মে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, আইটি অফিসার অথবা ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার ১০০% সুযোগ থাকে। এছাড়াও মার্কেটপ্লেসে ফ্রিল্যান্সিং করে ঘরে বসেই ডলার আয়ের সুযোগ তো থাকছেই।
২. ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (Diploma in Electrical Engineering)
বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক সভ্যতা অচল। তাই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা দেশে এবং বিদেশে সব সময় বেশি। DMRSTI-তে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, কারণ এর ব্যবহারিক প্রয়োগ অনেক বিস্তৃত।
- যা যা শেখানো হয়: ইলেকট্রিক্যাল সার্কিট, পাওয়ার জেনারেশন ও ডিস্ট্রিবিউশন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন (PLC), ট্রান্সফরমার ও মোটর টেস্টিং, এবং ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের খুঁটিনাটি।
- ক্যারিয়ার সম্ভাবনা: সরকারি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (PDB, REB, DESCO), বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্ট, টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি এবং দেশের বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি বা গার্মেন্টসে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। বিদেশে (মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপে) ইলেকট্রিক্যাল ডিপ্লোমা হোল্ডারদের প্রচুর চাহিদা ও উচ্চ বেতনের সুযোগ রয়েছে।
স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং NSDA অনুমোদিত শর্ট কোর্স
৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সের পাশাপাশি যারা খুব দ্রুত কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চান, তাদের জন্য DMRSTI-তে রয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের শর্ট কোর্স (Short Courses) এবং NSDA (National Skills Development Authority) অনুমোদিত বিশেষ ট্রেনিং প্রোগ্রাম।
NSDA কোর্স কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত NSDA হলো এমন একটি সংস্থা, যা কারিগরি দক্ষতাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। DMRSTI-তে NSDA-এর সিলেবাস অনুযায়ী যে কোর্সগুলো করানো হয়, তা সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীরা সরাসরি RPL (Recognition of Prior Learning) অ্যাসেসমেন্টে অংশগ্রহণ করে সরকারি লেভেল সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোর্সগুলো হলো:
- IT Support Service (Level 3 & 4): কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ইন্সটলেশন এবং ট্রাবলশুটিং-এর উপর প্রফেশনাল ট্রেনিং।
- Web Design (Level 3): আধুনিক ওয়েব পেজ ডিজাইন এবং ফ্রিল্যান্সিং গাইডলাইন।
- Computer Operation: অফিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ডেটা এন্ট্রি এবং এমএস অফিসের (MS Office) সম্পূর্ণ কাজ।
- ইলেকট্রিক্যাল হাউজ ওয়্যারিং ও মোটর ওয়াইন্ডিং: ইলেকট্রিক্যাল কাজের শর্ট কোর্স, যা শেষ করে সহজেই দেশে-বিদেশে কাজ পাওয়া সম্ভব।
কেন DMRSTI বেছে নেবেন? (সুযোগ-সুবিধাসমূহ)
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে অবস্থিত হলেও এই প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা রাজধানী ঢাকার যেকোনো প্রথম সারির পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সমকক্ষ। এর পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ:
১. অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি (Modern Labs): কারিগরি শিক্ষার মূল প্রাণ হলো প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক কাজ। এখানে রয়েছে হাই-কনফিগারেশন পিসি সম্বলিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেডের সরঞ্জামযুক্ত উন্নত ইলেকট্রিক্যাল ল্যাব।
২. অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকমণ্ডলী: শুধু বইয়ের পড়া নয়, বরং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য এখানে রয়েছেন একঝাঁক তরুণ, উদ্যোমী এবং ইন্ডাস্ট্রি-অভিজ্ঞ শিক্ষক, যারা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে হাতে-কলমে কাজ শেখান।
৩. মনোরম ক্যাম্পাস পরিবেশ: কৃষ্ণনগরের কোলাহলমুক্ত এবং সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পাসটি পড়াশোনা এবং শেখার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং নিরবচ্ছিন্ন ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) সুবিধা।
৪. ইন্ডাস্ট্রি লিংকেজ ও জব প্লেসমেন্ট: পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারে প্রবেশ করানোর জন্য প্রতিষ্ঠানটির জব প্লেসমেন্ট সেল (Job Placement Cell) কাজ করে। বিভিন্ন লোকাল ও ন্যাশনাল কোম্পানির সাথে তাদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
ভবিষ্যতের কারিগর তৈরিতে DMRSTI-এর ভূমিকা
দিনাজপুর বা বীরগঞ্জের মতো এলাকা থেকে উঠে এসে একজন ছাত্র যখন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কোনো বড় কোম্পানিতে চাকরি পায় বা নিজেই আইটি ফার্ম গড়ে তোলে, তখন শুধু সেই ছাত্রের পরিবারেরই নয়, পুরো এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। ডা. ইঞ্জিনিয়ার মামুনুর রশীদ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট ঠিক এই পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে কাজ করছে। তারা শুধু সার্টিফিকেট দিচ্ছে না, বরং শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার মতো শক্ত হাতিয়ার।
উপসংহার ও ভর্তির তথ্য
আপনি বা আপনার সন্তান যদি এসএসসি (SSC) পাসের পর সাধারণ শিক্ষার গণ্ডিতে আটকে না থেকে দ্রুত এবং নিশ্চিত ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (কম্পিউটার বা ইলেকট্রিক্যাল) হতে পারে সবচেয়ে সেরা সিদ্ধান্ত। আর এই স্বপ্ন পূরণে ডা. ইঞ্জিনিয়ার মামুনুর রশীদ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট (DMRSTI) আপনাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট (NSDA) শর্ট কোর্সে ভর্তি চলছে। আসন সংখ্যা সীমিত হওয়ার কারণে আগ্রহীদের দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। উন্নত ল্যাব, দক্ষ শিক্ষক এবং সুন্দর ক্যাম্পাস—সব মিলিয়ে আপনার কারিগরি শিক্ষার সেরা গন্তব্য হোক কৃষ্ণনগর, বীরগঞ্জ-এর এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি।